Breaking News
Home / Top / আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব হরণ সংবিধান পরিপন্থী

আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব হরণ সংবিধান পরিপন্থী

বঙ্গনূর সম্পাদকীয়:

আসাম প্রদেশ। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন এই প্রদেশটিকে গঠন করে ১৮৭৪ সালে। এর আগে ঠিক আসাম বলে কোনো রাজ্য ছিল কি না আমার তা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন কামরূপ বলতে আসামের একটি জেলাকে বোঝায়। কিন্তু প্রাচীন যুগে কামরূপ বলতে বোঝাত একটি বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগকে। যার পূর্ব-দিক ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে উত্তর বার্মা (মিয়ানমার) থেকে শান জাতির আহোম নামক একটি বিশিষ্ট শাখা এসে দখল করে। ‘শান’ নাম অথবা আহোম বা অসম থেকে উদ্ভব হয়েছে আসাম নামে। তাই আসাম নামটি যে খুব পুরনো তা বলা যায় না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমলেই বিশেষভাবে এই নামটি প্রচলিত হয়েছে।

অহম রাজা চক্রংফা ১৬৯৫-১৭১৪ সালের মধ্যে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নেন। নাম গ্রহণ করেন রুদ্র সিংহ। তার সময় থেকে আসামের শান ভাষা আর থাকে না। শান ভাষার স্থান অধিকার করে বর্তমান অসমীয়া ভাষা। যাকে প্রাচীন কামরূপী ভাষারই একটি বিশেষ রূপান্তরিত রূপ বলে জানা যায়। যে অঞ্চল নিয়ে আসাম প্রদেশ গঠন করা হয় তার জনসংখ্যা ছিল খুব কম। এর সাথে তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বাংলাভাষী কয়েকটি জেলা আলাদা করে নিয়ে তখন যোগ করা হয় গঠিত আসাম প্রদেশের সাথে। এগুলো হলো ধুবড়ী, গোয়ালপাড়া, শ্রীহট্ট (সিলেট) ও কাছাড়। শ্রীহট্ট যোগ করা হয় ১৮৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। আসাম সরকারের ছিল না কোনো হাইকোর্ট। আসামের বিচারালয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হতো কলকাতার হাইকোর্ট দিয়ে। আসামের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। আসামের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে। আসামের ছিল না কোনো সমুদ্রবন্দর। কলকাতা বন্দর দিয়েই বিদেশে রফতানি হতো তার বিখ্যাত চা। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড জর্জ ন্যাথিনিয়েল কার্জন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে পনেরোটি বাংলা ভাষাভাষী জেলা ও আসাম প্রদেশকে একত্র করে গঠন করেন একটি নতুন প্রদেশ। যার নামকরণ করা হয়Eastern Bengal and Assam Province. এই নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা। যার ফলে এই প্রদেশে সৃষ্টি হতে পারে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম প্রাধান্য। কিন্তু এ জন্য আসামের অধিবাসীরা কোনো প্রতিবাদ উত্থাপন করেন না তারা মেনে নেন এই প্রশাসনিক কাঠামোকেই। কিন্তু বাংলাভাষী হিন্দুরা শুরু করেন প্রবল আন্দোলন। যার ফলে ১৯১১ সালে এই তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। গঠিত হয় নতুন Bengal Province উদ্ভব হয় নতুন Bihar- Orissa Province. আসামকে আবার আগের মতোই একটা চিফ কমিশনারের শাসনাধীন প্রদেশে পরিণত করা হয়।

আসামের বাংলাভাষীরা অসমীয়া ভাষা শেখার বিপক্ষে কোনো প্রতিরোধ গড়তে চাননি। কিন্তু হিন্দু প্রধান কাছাড় জেলার মানুষ আন্দোলন করেছেন। কাছাড় জেলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যম হতে হবে বাংলা আর জেলার সরকারি কাজকর্ম চলতে হবে বাংলা ভাষার মাধ্যমে। তারা এ নিয়ে বিশেষ আন্দোলন করেন। কাছাড় জেলা সদর হলো শিলচর। এখানে শতকরা ৩৯ জন হলেন মুসলমান। এরা প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলন না করলেও ভাষা আন্দোলনকে জানিয়ে ছিলেন নীরব সমর্থন। কিন্তু এখন আসামে যেন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে বাংলা হলো কেবল মুসলমানের ভাষা। হিন্দুর ভাষা নয়। আসাম থেকে তাই তাড়াতে হবে বাংলাভাষী মুসলমানকেই, হিন্দুকে নয়। এই বিপুল মুসলমানদের আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হবে? যদি ঠেলে দেওয়া হয় তা হবে বাংলাদেশের জন্য মহাবিপর্যয়। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসার চেয়েও আরো ভয়ঙ্কর। সংবিধানের পাঁচ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভারতের নাগরিকেরা সবাই হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিক কোনো প্রাদেশিক সরকারের নাগরিক নন। আমরা জানি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে দ্বিনাগরিক প্রথা। সেখানে যেমন সবাই হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিক। তেমনি আবার প্রত্যেকে হলেন নিজ নিজ রাষ্ট্রের নাগরিক। রাজ্য সরকারের পৃথক নাগরিকত্ব বলে কিছু নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নররা নির্বাচিত হন নিজ নিজ রাষ্ট্রের ভোটারদের ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদরে দেশে প্রত্যেক রাজ্যের রাজ্যপালরা (গভর্নর) নিযুক্ত হন কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক এবং রাজ্যপাল পারেন প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। কেন্দ্রীয় সরকার পারে প্রত্যেক রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা রদবদল করতেও। কী করে আসাম সরকার নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বিধিবিধান রচনা করতে পারে? সেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আসামের সাথে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আছে সাধারণ সীমান্ত। সেখান থেকে প্রচুর বাংলাভাষী মুসলমান ইচ্ছা করলেই যেতে পারেন আসামে। তাদের আসামে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাই আসাম সরকার কোনো আইন করতে পারে না। কিন্তু আসাম যে নাগরিকত্ব আইন করতে যাচ্ছে, যেটা সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আসাম সরকার মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে। একটি প্রাদেশিক সরকার কী করে আরেকটি প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করতে পারে, সেটাও আমার উপলদ্ধিতে আসছে না। তাই নানা কারণেই আসাম হয়ে উঠছে আমাদের জন্য ভাবনার বিষয়।

9,342 total views, 15 views today

Spread the love

About Banganur

Check Also

মনিটরিংয়ের অভাব, ৪ঘণ্টায় ভারতে নির্মিত ভ্যাকসিন কার্যকারিতা হারাবে

বঙ্গনুর ওয়েব নিউজ ;ভারতে নির্মিত কোভিশিল্ড কিংবা কোভ্যাকসিন খোলার ৪ঘণ্টার মধ্যে গ্রহীতার শরীরে পুশ করতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 2 =

x